রাজবাড়ীতে বিলুপ্তপ্রায় দেশি মাছের উৎপাদনে ফিরছে সুদিনছবি : বাসসরাজবাড়ী, ২৩ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস) : দেশের মৎস্য সম্পদ ও জলজ জীববৈচিত্র্য ধ্বংসে চায়না দুয়ারী জাল অন্যতম। চায়না কারেন্ট দুয়ারী জাল দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছের যেমন সর্বনাশ করেছে, তেমনি দেশের নদ-নদী খাল বিলে দেশি মাছ পাওয়ার ধারণা পাল্টে দিয়েছে।জেলায় এমন এক সময় ছিল, যখন রাজবাড়ী জেলার নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয় ছিল সুস্বাদু ও দেশি মাছের অন্যতম নিরাপদ আবাসস্থল। এখানকার নদ-নদীসহ জলাশয়ের পানিতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। তবে কালের বিবর্তনে জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত বিরূপ প্রভাব, জলাশয় ভরাট ও প্রজননক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ায় অনেক দেশি প্রজাতির মাছ আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে।তবে গত কয়েক বছর ধরে জেলা মৎস্য বিভাগের প্রচেষ্টায় মাঠপর্যায়ে মৎস্য চাষীদের মধ্যে বাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে এসব বিলুপ্ত প্রায় দেশি মাছের উৎপাদনে অপার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।জেলা মৎস্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, রাজবাড়ী জেলায় নদী, বিল, প্লাবনভূমি, পুকুর, হাওর-বাওরসহ মোট মৎস্য প্রজনন উৎপাদনের ক্ষেত্রের আয়তন ৪৪ হাজার ৮৮১ হেক্টর। ২০২৪-২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় প্রতিবছর ৩৩ হাজার ২৫২ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়। এ জেলায় মোট মাছের চাহিদা ২২ হাজার ২৩৯.৮৬ মেট্রিক টন। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ১১০১২ মেট্রিক টন বেশি হওয়ায় উদ্বৃত্ত মাছ জেলার চাষিরা দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করে থাকেন।জেলা মৎস্য অধিদপ্তর আরও জানিয়েছে, জেলায় হারিয়ে যাওয়া বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পুনরায় চাষাবাদের জন্য ৬টি অভয়াশ্রম তৈরি করা হয়েছে। জেলার গোয়ালন্দ উপজেলায় ১টি, কালুখালী উপজেলায় ২ টি, পাংশা উপজেলায় ১ টি এবং বালিয়াকান্দিতে ২টি।মৎস্য সংশ্লিষ্ট ও চাষিরা জানান, আমাদের এলাকায় গত কয়েক বছর আগেও দেশি কই, শিং, মাগুর, টেংরা ও পাবদার মতো মাছের সরবরাহ তুলনামূলকভাবে ছিল না বলেই ধরা হতো। বর্তমানে আধুনিক চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করে বদ্ধ পুকুরেও এসব মাছ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে স্থানীয় বাজারে দেশি মাছের সরবরাহ আগের তুলনায় বেড়েছে। বালিয়াকান্দি উপজেলার মৎস্য কর্মকর্তা তানভীর আহমেদ বাসসকে বলেন, অভয়াশ্রম স্থাপনের ফলে নির্দিষ্ট এলাকায় সরকারিভাবে মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকায় এলাকার কেউ মাছ ধরার সাহস পায় না। ফলে ‘মা’ মাছ অবাধে ডিম ছাড়ার সুযোগ পায়, যা অভয় আশ্রম প্রতিষ্ঠার আগে সম্ভব হতো না। এর ফলে দেশীয় প্রজাতির মাছের সংখ্যা আগের তুলনায় বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এতে এখানকার সুফোলভোগী মৎস্য চাষিরা লাভবান হচ্ছেন।তিনি বলেন, বিশেষ করে দেশি কই, শিং, মাগুর, বাইন, গুতুম, চান্দা, টেংরা, পাবদা, ঢেলা ও মলা জাতীয় মাছের চাষ ও উৎপাদন বাড়ায় বাজারে আবারও এসব মাছের সরবরাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে।তানভিরুল ইসলাম বলেন, দেশি প্রজাতির মাছ সংরক্ষণ ও উৎপাদন বাড়াতে জলাশয়ে অভয়াশ্রম স্থাপন, পোনা অবমুক্তকরণ, চাষিদের প্রশিক্ষণ ও উদ্বুদ্ধকরণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে আগামীতে দেশি মাছের উৎপাদন আরও বাড়বে এবং বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা অনেক প্রজাতি আবারও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে বলে আশা করছি। তিনি আরও বলেন, দেশি মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ আমিষের চাহিদা যেমন পূরণ করবে, তেমনি মাংসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনবে। শুধু মাছের চাহিদা পূরণেই নয়, বরং দেশের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।জেলা মৎস্য অধিদপ্তররের কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহবুবুল হক বাসসকে বলেন, প্রাকৃতিক জলাশয়ে মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সংরক্ষণের পাশাপাশি বদ্ধ জলাশয় ও পুকুরে দেশি প্রজাতির মাছ চাষে চাষিদের উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন দেশি মাছের উৎপাদন বাড়ছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান ও মৎস্য চাষিদের আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।